Somoy Poriborton
————————————————————————
ভ্যালেন্টাইন্স ডে উপলক্ষে একটা ছোট গল্প লিখলাম। গল্পের নাম সময় পরিবর্তন। গল্পে বর্নিত চরিত্র ও ঘটনাবলী সম্পূর্নই কাল্পনিক। বাস্তবের সাথে এর কোনো মিল থেকে থাকলে, তা সম্পূর্নই অনিচ্ছাকৃত ও কাকতালীয়। আশা করি গল্পটি সবার মন জয় করতে পারবে। কেমন লাগলো আপনাদের, যদি তা জানতে পারি, তাহলে বড় আনন্দ অনুভব করবো আমার মনে।
————————————————————————
১
“কি গো? কি হলো তোমার? কথা বলছো না যে?” - ডান কানের দুলটা খুলতে খুলতে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে একটু আড় চোখে অনিলের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে পৌশালী।
অনিল ল্যাপটপের দিকে তাকিয়ে খুব গম্ভীর ভাবে ল্যাপটপের ট্র্যাকপ্যাডে তার আঙ্গুল বুলিয়েই যেতে থাকে কোনো কথা না বলে।
এবার অপর কানের দুলটা খুলে ড্রেসিং টেবিলটার ওপর রেখে অনিলের দিকে ঘুরে দাঁড়ায় পৌশালী। কৌতূহল ও সন্দেহ মেশানো দুই চোখে একবার অনিল ও একবার অনিলের ল্যাপটপের স্ক্রীনকে দেখে সে আবারও প্রশ্ন করে, “কি হলো বলো তো তোমার? এতো চুপ মেরে গেলে কেনো বলো তো?”
অনিল এখনো চুপ। বিছানার একপাশে বালিশে হেলান দিয়ে বোসে সে এক মনে ট্র্যাকপ্যাডের ওপর তার অঙ্গুলিহেলনেই রত থাকলো। তার ডান পাশে, বিছানার অপর প্রান্তে অফিস থেকে কিঞ্চিত সময় আগে ঘরে ফেরা তার স্ত্রী তার দিকে সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে যে তাকিয়েই আছে, তার দিকে তার যেন কোনো ভ্রূক্ষেপই নেই। বলা ভালো, পৌশালীর দিকে সে যেন ইচ্ছে করেই তাকাতে চায় না।
“হলো টা কি রে বাবা এর আবার!” - ভাবে পৌশালী। এরপর হঠাৎই মুখে একগাল হাসি নিয়ে অত্যন্ত আনন্দভরে বিছানায় উঠে জড়িয়ে ধরে সে অনিলকে। অনিল পৌশালীর এই অতর্কিতে ভালোবাসাপূর্ণ আক্রমনের জন্য তৈরী ছিলো না। সে সম্পূর্ন থতোমতো খেয়ে পৌশালীর দিকে তাকিয়ে বলতে থাকে, “আরে, আরে, কি হচ্ছে? এই ধ্যাৎ, ছাড়ো। আরে আরে...”
পৌশালীও নাছোড়বান্দা। সেও মোটেই ছাড়বার পাত্র নয়। সে অনিলের ডান গালে একটা সজোরে চুমু খায়। অনিলের তখন ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি অবস্থা। তার ডানদিকের চোখটি পৌশালীর চুমুর চোটে গেছে বন্ধ হয়ে। মুখ থেকে শুধু কিছু অস্ফুট গোঙ্গানীর মতো শব্দ বেরিয়ে আসছে তার। হাত পা তার প্রায় শক্ত হয়ে সোজা হয়ে গেছে।
বেশ কিছুক্ষন পর পৌশালীর অকস্মাৎ চুম্বন আক্রমনের হাত থেকে রেহাই পেয়ে ডান দিকের চোখটি খুলে তার দিকে তাকিয়ে আস্তে আস্তে হাঁফাতে থাকে অনিল। তার গলা জড়িয়ে তার দিকে এক গহন ও মোহময় কিন্তু ঈষৎ জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে পৌশালী। মুখে তার মৃদু হাসি। অনিলের নিঃশ্বাসের ওঠা নামার সাথে সাথে পৌশালীর আলিঙ্গনরত দেহও একবার উঠছে এবং পরক্ষনেই নেমে যাচ্ছে।
অনিল কিছুক্ষনের জন্য পৌশালীর সেই মায়া মিশ্রিত মুখশ্রীর দিকে তাকিয়ে বিমূঢ় হয়ে পড়ে। পরক্ষনেই একটু কেসে আমতা আমতা করে বলে ওঠে, “এই কি হচ্ছে টা কি? ছাড়ো আমায়, ছাড়ো বলছি...”। নিজের দেহটিকে পৌশালীর আলিঙ্গনরত নাগপাশ থেকে ছাড়ানোর বিফল চেষ্টা করতে থাকে অনিল।
পৌশালী এবার আরো একটু জোরে আলিঙ্গনে আবদ্ধ করে অনিলকে। অনিলের আবার নিঃশ্বাস বন্ধ হবার জোগাড়। পৌশালী এবার গদ গদ স্বরে বলে, “না, মোটেও ছাড়বো না। যতোক্ষন না তুমি বলবে তোমার কি হয়েছে, ততোক্ষন এইভাবেই জড়িয়ে থাকবো তোমায়।” তারপর সেই একইরকম মোহময় জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে সে অনিলের দিকে।
কিছুক্ষন পর, একটু ধাতস্থ হয়ে অনিল খুবই আমতা আমতা গলায় কিছু বলবার চেষ্টা করে। সে চাইছে তার কথাগুলি তার মুখ থেকে বেরিয়ে আসুখ একেবারে পুরুষ সিংহের গর্জনের মতো। কিন্তু সেই স্বর কোথায় যেন তার লোপ পেয়েছে পৌশালীর মোহময় মুখশ্রীর সামনে। সে খুব কষ্ট করে রাগত স্বরে বলে, “এতো দেরী হলো যে বাড়ি ফিরতে?”
পৌশালী এই প্রশ্নের জন্য একেবারেই তৈরী ছিলো না। তার আলিঙ্গনের নাগপাশ একটু যেন আলগা হলো। তার মুখের হাসিটাও মিলিয়ে গিয়ে মুখটা হয়ে উঠলো একটু কঠিন। তার মোহময় জিজ্ঞাসু দৃষ্টি রূপান্তরিত হলো কেবল তীব্র জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে। একটু কঠিন ও জিজ্ঞাসু গলায় সে প্রশ্ন করলো, “মানে? দেরী কোথায় হলো? সাড়ে সাতটাই তো বাজে। যেমনটা তুমি বলেছিলে।”
ক্ষনিকের নিস্তব্ধতা। দুজনেই গভীর সুতীক্ষ্ন দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে দুজনের দিকে। সেই নিস্তব্ধতার মধ্যে পৌশালী অনিলের মুখের দিকে তাকিয়ে কিছু যেন একটা আন্দাজ করলো। তারপর ভ্রু কুঁচকে সে একটু শান্ত অথচ জিজ্ঞাসু স্বরে প্রশ্ন করলো, “কি ব্যাপার বলো তো? তুমি ফিরেছো কখন?”
অনিল যেন এই প্রশ্নটারই অপেক্ষায় এতোক্ষন বোসে ছিলো। কাঙ্ক্ষিত প্রশ্নটি শ্রুতিগোচর হওয়ায় সে যেন পারলে বিছানাতেই লাফ দিয়ে দাঁড়িয়ে পরে। সে চোখের নিমেষে সোজা হয়ে বোসে বেশ গম্ভীর ও জোর গলায় পৌশালীর দিকে তাকিয়ে বোলে ওঠে, “পুরো এক-টা ঘন্টা আগে।” দাঁতে দাঁত ঘষে প্রায় কিড় মিড় করতে থাকে সে।
পৌশালী অনিলের এই হঠাৎ পরিবর্তনে একটু হতচকিত হয়ে যায়। তবে অনিলের কথা শুনে, সম্বিত ফিরে পেতে তার বেশি সময় লাগে না। সে নিজের হাসি আর চেপে রাখতে পারে না। অনিলের দিকে তাকিয়ে প্রথমে মুখে হাত চাপা দিয়ে ফিক করে হেসে ফেলে। তারপর সেই হাসি রূপান্তরিত হয় প্রায় অট্টহাস্যে। বিছানায় শুয়ে সে গড়াগড়ি খেতে থাকে হাসতে হাসতে।
২
অনিল ও পৌশালীর আলাপ কর্মসূত্রে। কলেজ শেষ করে অনিল কোলকাতার এক নামি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানীতে কাজ পায়। তার চাকরি পাবার ৩ মাস পর পৌশালীও কর্মসূত্রে ট্রান্সফার হয়ে আসে কোলকাতায় সেই একই অফিসে। তারপর আস্তে আস্তে তাদের মধ্যে বাড়তে থাকে ঘনিষ্ঠতা এবং গঙ্গা দিয়ে ৩-৪ বছর ধরে প্রচুর জল বয়ে যাবার পর তারা বাঁধা পরে বিয়ের বন্ধনে।
পৌশালী বেশ কিছুদিন ধরেই চেষ্টা করছিলো দেশের বাইরে ট্রান্সফার নিয়ে আসবার। তবে অনিল তো পুরোই বিপরীত মনের মানুষ। তার বড় অনিচ্ছা ঘর ছেড়ে যাবার। আবার সে পৌশালীকেও ছাড়তে পারবে না। এই নিয়ে তাদের দুজনের মধ্যে প্রায়শই কথা কাটাকাটি লেগেই থাকতো।
- অনিল বলে, “বাইরে চলে গেলে বাবা মাকে দেখবে কে? তাদেরও তো বয়স হয়েছে।”
- পৌশালী অমনি রাগত স্বরে বলে, “বাবা মা কি তোমার একার আছে? আমার নেই? না কি আমি বানের জলে ভেসে এসেছি? আমার চিন্তা হয় না তাদের জন্য? কি মনে হয় তোমার?”
- অনিল তখন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে আমতা আমতা করে বলতে থাকে, “আরে রেগে যাচ্ছো কেন? না না আমি ওভাবে কিছু বলিনি।”
- “ওভাবে বলো নি তো কি ভাবে বলেছো তুমি? বাবা মার জন্য আমার কষ্ট হয় না বুঝি? তোমার একারই কষ্ট হয়?” - রাগে গজরাতে থাকে পৌশালী।
অনিল চুপ করে থাকা শ্রেয় বিচার করে সে বাধ্য ছেলের মতো পৌশালীর সামনে দাঁড়িয়ে থাকে তার মুখের দিকে তাকিয়ে। তবে মনে মনে সে তার সামনে রাগত অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকা পৌশালীর প্রশংসা না করে পারে না। সে যে নিজের সাথে সাথে তার প্রনয় সম্পর্কে আবদ্ধ মানুষটির কথাও এতো গভীর ভাবে ভাবে, তা দেখে সত্যিই খুশি হয় অনিল।
রাগ কমলে পর, একটু কম গম্ভীর গলাতে সে অনিলকে আদেশ করে, “এই আসছে নতুন প্রোজ্ক্টটায় তুমি আমার সাথে অ্যাপ্লাই করবে। একসাথে চান্স পেলে ভালো, না হলে আবার পরে দেখা যাবে।”
পৌশালীর কথামতোই অনিল ও অ্যাপ্লাই করে বিবিধ নতুন প্রোজেক্ট গুলোয় যেখানে তারা দুজনে একসাথে দেশের বাইরে যেতে পারবে এবং একই সঙ্গে কাজ করতে পারবে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে যে তারা দুজনে কখনোই একই জায়গায় ট্রান্সফার হবার সুযোগ পায় না। কখনো পৌশালী পায় তো অনিল পায় না। কখনো বা উল্টোটা। কখনো বা দুজনেই ট্রান্সফারের সুযোগ পায় ঠিকই কিন্তু তারা সেই কাজে গেলে তাদের “রিলেশানসিপের” আগে “লঙ্গ্ ডিস্ট্যান্স” কথা দুটি যুক্ত হয়ে যাবে। তাই তারা নানান সুযোগ পেয়েও সেগুলিকে হাতছাড়া করে।
অবশেষে একদিন ভাগ্য তাদের সহায় হলো। তারা একই সাথে ট্রান্সফারের সুযোগ পেলো অ্যামেরিকায় ইন্ডিয়ানা রাজ্যের সাউথ বেন্ড শহরে। না, তবে ঠিক একই শহরে তারা ট্রান্সফার পায়নি। পৌশালী পরে জানতে পারে তার প্রোজেক্টটা ট্রান্সফার্ড হয়ে চলে গেছে কাছের লা পোর্টে শহরে। প্রথমে দমে যায় সে। অনিল মনে মনে খুব খুশি। সে ভাবে হয়তো এবারও ট্রান্সফারটা পৌশালী নাকচ করলো বলে। কিন্তু তার আনন্দিত চিত্ত হরন করে পরে পৌশালী অনিলকে বলে, “ফাইনালি কিছু একটা হলো। আমি নেটে দেখেছি লা পোর্টে সাউথ বেন্ড থেকে জাস্ট ৩৬ মিনিটের পথ। ও চাপ নেই। আমি ওখানে একটা অ্যাপার্টমেন্ট দেখবো। আর তুমি সাউথ বেন্ডে একটা অ্যাপার্টমেন্ট দেখো। এক বছরের মধ্যে আমরা একটা গাড়ি কিনে নেবো। আর তারপর তুমি আমার অ্যাপার্টমেন্টে সিফ্ট হয়ে যাবে। সাউথ বেন্ডে ঘরের দাম বেশীই হবে, বড় শহর বলে কথা।”
একটু থেমে পৌশালী অনিলের কাছে এগিয়ে এসে তার হাতে নিজের হাতটা রেখে স্মিত হাসি হেসে বললো, “জানি তোমার একটু কষ্ট হবে এক বছর। আমারও যে হবে না তা নয়। তবে আমরা প্রতিদিন ভিডিও কলে কথা বলবো। আর চেষ্টা করবো মাসে অন্তত একবার একে অন্যের বাড়ি যাবার, কেমন?” মাথাটা একটু নাড়িয়ে অনিলের দিকে তাকিয়ে থাকে সে।
অনিল যে কি বলবে সেটাই বুঝে উঠতে পারে না। সে ভেবেছিলো কি, আর এসব হলোটা কি! তার মন চায় প্রতিবাদ করতে। কিন্তু চোখের সামনে স্নিগ্ধ হাসিতে হাস্যরত পৌশালীকে দেখে তার আর প্রতিবাদ করতে মন চায় না। সে একটা ঢোঁক গিলে পৌশালীর দিকে ভ্যাবাচ্যাকা দৃষ্টিতে তাকিয়ে একটা কিম্ভূতমার্কা হাসি হেসে শুধু বলে, “হেঁ”।
পৌশালী এবার অনিলের গালদুটো দুহাতে টিপে দিয়ে বলে, “এই তো, সোনা ছেলে।” তারপর গালদুটো দুবার নাড়িয়ে দেয় সে। অনিল কাষ্ঠপুতুলের মতো দাঁড়িয়েই থাকে ঠায়। তার বিমূঢ়তা ভাঙ্গতে ঢের দেরী লাগবে হয়তো। এরপর, হাত নামিয়ে প্রনাম করবার ভঙ্গিতে নিজের বুকের কাছে হাত গুলো তুলে আনে পৌশালী। তারপর সে বলে, “ও গড্, থ্যাঙ্ক ইউ সো মাচ! কত্তো কত্তো দিন ধরে ওয়েট করবার পর ফাইনালি এরকম একটা সুযোগ পেলাম। সব যেন ঠিক ঠাক ভাবে হয়ে যায় একটু প্লীস দেখো, প্লীস।” এরপর অনিলের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সে চলে যায় নিজের কাজে। অনিল দাঁড়িয়ে থাকে অনড় ভাবেই।
অনিল আর পৌশালীর বিয়ে হয়েছে গত বছর। তারা বিয়ের কিছুদিন পরেই চলে আসে অ্যামেরিকায়। তাদের পরিকল্পিত চিন্তা মতো পৌশালী থাকে লা পোর্টে শহরে এবং অনিল থাকে সাউথ বেন্ড শহরে। অ্যামেরিকায় আসবার ৬-৭ মাস পর অনিল একটি সেকেন্ড হ্যান্ড গাড়ি কেনে। সে পৌশালীকেও গাড়ি কেনবার জন্য আর্জি জানায়। কিন্তু পৌশালী এক্ষুনি গাড়ি কিনতে নারাজ। সে বলে, “আরে ও টা তোমার বেশী দরকার। তুমি তাড়াতাড়ি শিখে নিয়ে আমার কাছে প্রায়শই আসতে পারবে। বেকার আর উবের খরচ দিতে হবে না। আমার আর কিসের দরকার এখন গাড়ি? অফিস তো সামনেই। দোকান পাঠও সামনা সামনি। ঐ এক বছর পর তুমি এখানে সিফ্ট হয়ে গেলে তখন তো গাড়ি পেয়েই যাবো। বেকার এখন খরচের কোনো দরকার নেই।” পৌশালীর এই বক্তব্য শোনবার পর আর কিছু বলতে পারে না অনিল। সে তার মতকে তাই পূর্ণ সায় দেয়।
তাদের পরিকল্পনা মতো এখন তারা মাসে অন্তত একবার একে অন্যের বাড়ি যায়। তবে লাইসেন্স পাবার পর অনিল একটু বেশীই আসে পৌশালীর বাড়িতে।
৩
আজ ভ্যালেন্টাইন্স ডে। তাও আবার শুক্রবার। অনিলের মন আজ সকাল থেকেই আনন্দে উদ্ভাসিত। সে ভেবে চলে পৌশালীকে আজ কি উপহার দেওয়া যায়। সে কি হঠাৎ করে পৌশালীর বাড়ি গিয়ে তাকে চমকে দেবে? তার অভিব্যক্তিটা তখন কিরকম হবে? ভেবে পায় না অনিল।
ঐ দিকে পৌশালীও আজ খুশি। সেও ভাবে আজ কি অনিল তার বাড়িতে আসবে? তার জন্য কিছু ভালো খাবার কি সে বানিয়ে রাখবে? সে কি তাকে একবার ফোন করে জানবে যে সে আজ আসবে কি না? এইসব ভাবতে ভাবতে বিহ্বল হয়ে পড়ে পৌশালীও।
অবশেষে তারা দুজনেই কেউ কাউকে কিছু না বলে নির্দিষ্ট সময়ে অফিসে যায়। দুজনেই আশা করতে থাকে এই বুঝি ফোনটা বেজে উঠলো। অপর সঙ্গীর মেসেজ বা ফোন কল ঢুকলো হয়তো ফোনে। কিন্তু সময় বেরিয়ে যেতে থাকে, ফোন আর বাজে না। দুজনের কেউই ঠিক ভাবে মন দিয়ে কাজ করতে পারে না।
শেষ মেষ অনিল ফোনটা করেই ফেললো পৌশালীকে। ফোনের ভাইব্রেশান শুনে কতোগুলো হৃৎস্পন্দন যে ওলট পালট হয়ে গেলো পৌশালীর, বুঝতে পারে না সে। ফোনের স্ক্রীনে অনিলের নাম ফুটে উঠেছে। সে যে কি ভাবে নিজের উত্তেজনা চেপে রাখবে বুঝতে পারে না। চোখ তার উজ্জ্বল। মুখে তার সুবিস্তৃত সুমধুর হাসি বিরাজমান। অনেক কষ্টে নিজের উত্তেজনাকে একটু দমিয়ে প্রচন্ড ব্যস্ত থাকবার ভান করে সে ফোনটা ধরলো।
- “হ্যাঁ, হ্যালো!”, বললো পৌশালী।
- অপর দিক থেকে হাসি ও উৎসাহ মিশ্রিত গলায় অনিলের উত্তর এলো, “হ্যাপী ভ্যালেন্টাইন্স ডে পৌশালী।”
- “থ্যাঙ্ক ইউ।”, বলে পৌশালী। মুখে তার হাসি আর একটু প্রস্ফুটিত হলো। তারপর আবার নিজেকে সামলে নিয়ে সে বললো, “সেম টু ইউ টু।”
- এবার অনিলের “থ্যাঙ্ক ইউ” বলার পালা। সেও প্রচন্ড উত্তেজনা ও আনন্দে লাল হয়ে উঠেছে।
- ক্ষনিকের নিস্তব্ধতা। তারপর, পৌশালী ইচ্ছে করে একটু ব্যস্ত হয়ে বলে, “হ্যাঁ বলো কি বলবে? আমি এখন একটু ব্যস্ত আছি।”
- অনিল কোনো সময় নষ্ট না করে বলে, “আজকে সাড়ে সাতটার সময় তোমার বাড়ি যাবো আমি ভাবছি। আজকের রাতটা একটু একসাথে উদযাপন করতে চাই। আর কাল পরশুও ছুটি। তাই দুদিন থাকা যাবে আর কি। তাই ভাবলাম তোমায় একবার কল করি, তোমার কোনো প্রব্লেম হবে কি না এতে সেটা জানতে।”
- পৌশালী তো পারলে আনন্দে লাফায় আর কি। সে আনন্দে চোখ বন্ধ করে দুহাত মুঠো করে ওপরে তুলে ও মুখে কোনো শব্দ না করে বলতে থাকে, “ ইইইইই ইয়েস, ইয়েস”।
- ও দিকে পৌশালীর কোনো উত্তর না পেয়ে অনিল বলতে থাকে, “পৌশালী? হ্যালো পৌশ.. আছো? হ্যালো?”
- আনন্দ এবার সম্বরন করে পৌশালী ফোনটা কানে ধরে। সে গম্ভীরভাবে আগের মতোই ব্যস্ততার সুরে বলে, “হ্যাঁ ঠিক আছে। আমি কাজগুলো সেরে নিই। রাতে তাহলে দেখা হচ্ছে।” কথাগুলো বলবার সময় তার পেট থেকে যেন হাসি বেরিয়ে আসতে চাইছে সোডার মতো।
- “বেশ, সি ইউ পৌশ টু নাইট”, বলে একটা চুমু খায় অনিল তার ফোনে। তারপর ফোনটা রেখে দেয়। মনটা তার আনন্দে আটখানা। সে নাচবে না গাইবে কি যে করবে কিছুই বুঝতে পারে না।
- অন্যদিকে পৌশালীও, “সি ইউ” বলে ফোনটা কেটে দিয়ে ফোনটায় একটা চুমু খায়। সে আনন্দে দাঁত মুখ কুঞ্চিত করতে গিয়েও নিজেকে সামলে নেয়। পাছে কেউ দেখে ফেলে তাকে!
৪
বিছানায় শুয়ে পড়ে গড়া গড়ি খেতে থাকা পৌশালীকে দেখে অনিল যে কি করবে বুঝে উঠতে পারে না। তার মাথা যায় আরও গরম হয়ে। সে রেগে মেগে বলে, “এতে এতো হাসির কি আছে শুনি? সেই এক ঘন্টা আগে থেকে আমি এসে ঘরে বোসে আছি আর মহারানির কোনো পাত্তাই নেই!”
এই কথা শুনে পৌশালীর হাসি বাড়লো বই কমলো না। সে বহু কষ্টে হাসি থামিয়ে পেটে হাত দিয়ে হাসতে হাসতে পেট ব্যাথায় কাতর হয়ে হাঁফাতে হাঁফাতে বললো, “তুমি এসে কি কি করেছো শুনি?”
অনিল গজরাতে গজরাতে বললো, “কি আর করবো? তোমার দেরী হচ্ছে দেখে প্রথমে ভাবলাম একটু অপেক্ষা করি। তারপর অনেকক্ষন দেরী হচ্ছে দেখে উঠে গিয়ে খাবারের টেবিলটা একটু সাজাতে শুরু করলাম, ক্যান্ডেল, ফুলের পাপড়ি কিনে এনেছি, ওগুলো দিয়ে। তারপরেও দেখছি তোমার কোনো নাম গন্ধ নেই। তখন বিরক্ত হয়ে ল্যাপটপটা খুলে বোসি।”
পৌশালী সব শুনে হাসি ও হাঁফানি মিশ্রিতভাবে বললো, “তুমি এতোক্ষনে একবারও ঘড়িটা দেখেছো?”
অনিল প্রায় খেঁকিয়ে উঠে বলে, “দেখবো না কেন। এইতো হাতেই পরে বোসে আছি। পৌনে ৯ টা বাজতে যায়।”
পৌশালী এবার দুষ্টুমি মিশ্রিত হাসি হেসে বলে, “তোমার হাত ঘড়িটা ছাড়া তোমার ফোন বা ল্যাপটপে টাইমটা দেখোনি তুমি একবারও এতোক্ষন ধরে?”
অনিল বিরক্ত হয়ে বলে, “আরে না রে বাবা। কি পার্থক্য আছে ফোনের টাইমের সাথে ঘড়ির টাইমের? আমি ঘড়িটাকে পুরো সেট করে রেখেছি ফোনের সাথে।”
“সত্যিই কি তাই?”, কৌতূক মিশ্রিত ভঙ্গিতে প্রশ্ন করে পৌশালী। একটু থেমে তারপর আবার সেই একই ভঙ্গিমায় সে বলে, “ল্যাপটপের সময়টা একবার দেখোতো। ওটাও কি তোমার ঘড়ির টাইমই দেখাচ্ছে?”
একটা জিজ্ঞাসা পূর্ন মুখভঙ্গি ফুটে ওঠে অনিলের মুখে। সে ভাবে পৌশালী কি বলে রে বাবা! তারপর তার কথা অনুসরন করে ল্যাপটপের দিকে তাকিয়ে তার চোখ জোড়া যায় স্থির হয়ে। নিমেষের মধ্যে তার মুখভঙ্গি পরিবর্তিত হয় প্রথমে বিস্ময়ে এবং পরে একটি রাগ ও বিরক্তি মিশ্রিত মুখভঙ্গিতে, যা সৃষ্টি হয়েছে কারন সে নিজের ভুলটা কোথায় সেটা বুঝতে পারা সত্ত্বেও এই রকম ভুল সে কি ভাবে করলো সেটা ভেবেই পাচ্ছে না।
ল্যাপটপে তখন বাজে পৌনে ৮ টা!
অনিল এবার আস্তে আস্তে সেই বিরক্তি ও রাগ মিশ্রিত মুখভঙ্গি পৌশালীর ওপর নিক্ষেপ করার সাথে সাথেই পৌশালী আবারও হাসিতে লুটিয়ে পড়ে বিছানায়।
অনিল সারাদিনের উত্তেজনার চোটে ভুলেই গিয়েছিলো যে সে যে শহরে থাকে সেখানকার ঘড়ি চলে ইস্টার্ন টাইম জোনে। কিন্তু পৌশালীর শহরের ঘড়ি চলে সেন্ট্রাল টাইম জোনে। ইস্টার্ন টাইম জোনের ঘড়ি সেন্ট্রাল টাইম জোনের ঘড়ির থেকে ১ ঘন্টা আগে চলে। এই কারনের জন্য অনিলের হাত ঘড়ি তাকে ইস্টার্ন টাইম জোনের সময় দেখাতে থাকে। কিন্তু সে যে এখন সেন্ট্রাল টাইম জোনে! সে তার হাত ঘড়ির সময় একটি ঘন্টা পিছোতেই ভুলে গেছে উত্তেজনার চোটে। আর সে এই ভুল করে ভেবে চলেছে যে পৌশালী দেরী করে ফিরেছে অফিস থেকে আজ এই ভ্যালেন্টাইন্স ডের দিনে! পৌশালীর ওপর থেকে সমস্ত রাগ এসে পড়ে তখন তার নিজের ওপর। সঙ্গে জমে ওঠে নিজের কৃতকর্মের জন্য তীব্র বিরক্তি।
বেশ কিছুটা সময় পরে দুজনেই ধাতস্থ হয় একটু। পৌশালী তখন আস্তে আস্তে অনিলের কাছে এসে বসে। তাকে এবার দুহাতে জড়িয়ে ধরে সে বলে, “পরের বার থেকে যখন বাড়ি থেকে বেরোবে তখন আমায় বোলো যে আমি অতো মিনিটের মধ্যে আসছি। বা তুমি আমায় আজকের মতো আগে আগে ফোন করলে বোলো বিকেলে আসবে। আর বেরোনোর আগে আমায় বোলো কতক্ষনের মধ্যে আসছো। তাহলেই আর কোনো অসুবিধে হয় না।” একটু থেমে সে আবার বলে, “ আর নইলে তুমি তোমার এই ঘড়িটা চেঞ্জ করে একটা স্মার্ট ওয়াচ কিনে নাও। তাহলে, আজকের মতো যদি তুমি আগে ভাগে এসেও যাও তাহলেও তুমি এরকম ক্ষেপে যাবে না।” একটু ফিক করে হেসে ফেলে অনিলের বুকের মধ্যে মুখ লুকোয় সে।
অনিল পৌশালীর সব কথা শোনে ও সব শেষে বিমূঢ়ভাবে দূরের দেওয়ালটার দিকে তাকিয়ে শুধু বলে, “সত্য সেলুকাস, কি বিচিত্র এই দেশ!....”
