Corona in Pujo (2nd Part)
————————————————————————
পুজো ও করোনা নিয়ে আরও একটি জনসচেতনতামূলক লেখা লিখলাম। আশা করি সবার ভালো লাগবে। লেখায় বর্নিত ঘটনা ও নামসমূহ সম্পূর্ন কাল্পনিক। বাস্তবের সাথে তার কোনো মিল থেকে থাকলে তা সম্পূর্নই কাকতালীয়।
————————————————————————
তিন্নি বাবাকে তার ছোট্ট দুটি হাতে জড়িয়ে ধরে বললো, “বাবা, বাবা, আজ রাতে ঠাকুর দেখতে যাবে তো?” তার বাবা, সাব-ইন্সপেক্টর শুভ্রনীল জুতোর ফিতে বাঁধছিলো। হঠাৎই মেয়ের এই প্রশ্ন শুনে তার হাতটি থেমে গেল। সে একবার তিন্নির দিকে তাকালো। ছোট্ট ৪-৫ বছরের মেয়েটি তাকে জড়িয়ে ধরে একগাল হাসি ও মনে একরাশ উৎসাহ নিয়ে বাবার উত্তরের অপেক্ষায় অপেক্ষারত। শুভ্রনীল মেয়ের মুখের দিক থেকে চোখ সরিয়ে নিয়ে এবার তার স্ত্রী ছন্দার দিকে তাকালো। ছন্দা একটু ম্লান হেসে আমতা আমতা করে বললো, “হ্যাঁ সোনা যাবো তো। এইতো আমাদের প্যান্ডেলে রাতে কত্তো ফান্কসান হবে, ঢাক বাজবে, আমরা মজা করবোই তো! আর কাল তুমি যে কবিতা বলবে স্টেজে ভুলে গেলে? চলো চলো আমরা একটু কবিতাটা প্র্যাক্টিস করে নি, বাবার দেরী হয়ে যাচ্ছে...” এই বলে সে তিন্নির দিকে এগিয়ে যায় তাকে বাবার কাছ থেকে সরিয়ে আনবার জন্য।
তিন্নি মাকে তার কাছে এগিয়ে আসতে দেখে বাবাকে আরও একটু জড়িয়ে ধরে কাঁদো কাঁদো স্বরে বললো, “না, আমি বাবার সাথে ঠাকুর দেখতে যাবো। বাবা, শিভূমি যাবো। রীনাও যাবে আজকে বাবা মার সাথে। আমিও যাবো।” ছন্দা এবার তিন্নিকে তার বাবার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে নেবার জন্য উদ্যত হলো। তাকে হাতের ইশারায় শুভ্রনীল থামিয়ে দিয়ে তিন্নিকে জড়িয়ে ধরে বললো, “যাবোতো! নিশ্চয়ই যাবো! রীনা শিভূমি যাবে তো কি হলো! আমরা তালপুকুর লেনের ঠাকুর দেখতে যাবো! কত্তো বড় ঠাকুর করেছে ওরা জানো! কত্তো লোক আসে ওই প্যান্ডেলটায়!” তিন্নি অবাক হয়ে বড় বড় চোখে বাবার দিকে তাকিয়ে তার কথাগুলো নিঃশব্দে শুনছিলো। সে ভুলেই গেছে যে তাদের বাড়ি তালপুকুর লেনেই, ও তার বাবা সেই লেনেরই একমাত্র পুজো প্যান্ডেলটির কথাই বলছে। ছোট্ট মেয়েটি তার বন্ধু রীনার কথা শুনে মনে করে শ্রীভূমির পূজোই হয়তো সবচেয়ে বড় পুজো। তার থেকেও যে কোনো বড় পুজো থাকতে পারে, সেটা সে ভাবতেই পারে না।
তিন্নি আনন্দবিহ্বল চোখে একগাল হাসি নিয়ে বাবাকে বলে ওঠে, “সত্যি! শিভূমির থেকেও বড় ঠাকুর!”
“হ্যাঁ”, বলে একটু হাসলো শুভ্রনীল। তারপর বললো, “আমরা যাবোতো ওখানে সবাই মিলে। তবে তার আগে তুমি একটু কবিতাটা মুখস্থ করে নাও, প্যান্ডেলে বলতে হবে তো তোমায় কালকে?”
তিন্নি অত্যন্ত খুশি হয়ে বাবার গালে একটা ছোট্ট চুমু খেলো। সে ভাবতেও পারেনি তার জন্য এতো বড় একটি চমক অপেক্ষা করছিলো। শুভ্রনীল মেয়ের ছোট্ট সুন্দর আদরটি পেয়ে তাকেও জড়িয়ে ধরে তারও গালে একটা ছোট্ট চুমু খেয়ে বললো, “আমার মিষ্টি তিন্নি!” তারপর তাকে ছেড়ে জুতোর ফিতেটা বেঁধে উঠে দাঁড়ালো, আর তিন্নির দিকে তাকিয়ে বললো, “টাটা সোনা!” তিন্নিও তার ছোট্ট একহাতে মার কাপড়ের একটি অংশ খামছে ধরে ও অন্য একটি হাতে বাবাকে হাত নাড়িয়ে বিদায় জানিয়ে বলে, “টাটা!” তারপর শুভ্রনীল ছন্দার দিকে একটু করুন ভাবে হেসে তাকিয়ে বেরিয়ে গেলো থানার উদ্দেশ্যে। আজ থেকে যে তার পুজোর ডিউটি শুরু হলো!
এক এক করে পুজোর দিনগুলো চলে গেলো। তিন্নি পুজোর প্রতিটা দিন তালপুকুর লেনের প্যান্ডেলেই তার বন্ধুদের সাথে খেলে বেড়ালো। অথচ সে তার স্বপ্নের তালপুকুর লেনের প্যান্ডেল, যে প্যান্ডেলের ছবি তার ছোট্ট মনে তার বাবা এঁকে দিয়েছিলো, সেখানে সে যেতে পারলো না...।
একাদশীর দিন সকালে ঘুম থেকে উঠে ক্লান্ত পায়ে আসতে আসতে বিছানা থেকে নেমে পাশের ঘরটার দরজার সামনে এসে থমকে দাঁড়ায় তিন্নি। “বাবা বাড়ি এসেছে! কি মজা! কিন্তু এত্তো গরমের মধ্যে বাবা চাদর চাপা দিয়ে শুয়ে আছে কেন?” এই ভেবে সে বাবার দিকে এক পা বাড়াতে যাবে, ঠিক তখনই তার হাতে পেছন থেকে টান পড়লো। সে মাথা ঘুরিয়ে পেছনে ফিরে দেখলো যে তার মা তার হাত ধরে পেছন থেকে টেনে রেখেছে। ছন্দা সেই অবস্থাতেই বললো, “না সোনা, বাবার শরীর খারাপ। খুব জ্বর হয়েছে। তুমি বাবার কাছে একদম যেও না এখন।” এই বলে সে তিন্নির হাতটা ধরে টেনে নিয়ে চললো পাশের ঘরে। যাবার আগে তিন্নি একবার বাবার দিকে ফিরে তাকায়। সে দেখে, বাবা অশ্রুমিশ্রিত চোখে মাথাটা বালিশ থেকে একটু তুলে তার দিকে করুন ভাবে তাকিয়ে আছে...।
সেইদিন শুভ্রনীলের ডাক্তারি পরীক্ষার পর জানা যায়, সে করোনা আক্রান্ত। এখন সে হাসপাতালে ভর্তি........।
মা দূর্গার কাছে প্রার্থনা করি, যে মানুষটা তাঁরই পুজোয় যাতে অন্য লোকের তাঁর দর্শন পেতে কোনো অসুবিধে না হয়, তার জন্য দিনরাত নিজের সংসার ভুলে ডিউটি করে গেছে, তাকে তিনি সারিয়ে তুলুন। তার সাথে আরও যাঁরা করোনা আক্রান্ত, তাদের সবাইকেই তিনি সারিয়ে তুলুন।
পুলিশ, ডাক্তার বা নার্সের মতো ইমার্জেন্সি সার্ভিস প্রদানকারী সমস্ত মানুষকে এই করোনা পরিস্থিতিতেও অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাবার জন্য আমি নত মস্তকে তাদের আমার প্রনাম ও শ্রদ্ধা জানাই। এই মানুষগুলির ইচ্ছা থাকলেও বা মনে ভয় থাকলেও তাদের বাড়িতে থাকবার কোনো উপায় নেই। তারা কাজ বন্ধ করে দিলে অন্য মানুষদের খেয়াল রাখবে কে? আমার মতো যারা এই সমস্ত মানুষগুলির বাড়ির লোক, তারা মোটামুটি জানি যে পুজোর ছুটিতে অন্য মানুষেরা যখন গোটা পরিবারের সাথে আনন্দে মেতে থাকে, তখন আমাদের কারোর বাবা, কারোর মা, কারোর দাদা, ভাই, দিদি বা বোন আমাদের ছেড়ে সারাদিন রাত সেই আনন্দে মেতে থাকা মানুষগুলির যাতে কোনো অসুবিধে না হয়, তার খেয়াল রাখতে থাকে। আমরা ছোটবেলা থেকে এই পরিস্থিতিতে থাকতে থাকতে আসতে আসতে নিজেদেরকে মানিয়ে নিয়েছি। তিন্নিও এইভাবে নিজেকে মানিয়ে নেবে একসময়....।
তবে শেষ করার আগে সবার কাছে আমার বিনীত অনুরোধ থাকবে, আপনারা মাস্ক না পরে বা ভুল ভাবে নাকের তলায় মাস্ক পরে রাস্তায় বেরিয়ে নিজেদের বিপদ দয়া করে ডেকে আনবেন না। হাসপাতালে লোক রাখার জায়গা নেই। বেডই যদি না থাকে তাহলে ডাক্তার চিকিৎসা শুরু করবে কি করে? তাদের শুধু শুধু দোষ দিয়েও কোনো লাভ নেই তাই। একইরকম ভাবে, আপনারা যতো বেশী করে রাস্তায় বেরোবেন ততো বেশী পরিমানে জানজটের সৃষ্টি হবে। তখন পুলিশকেই বা দোষ দিয়ে কি লাভ বলুন। তাই সমস্ত মানুষ যদি একটু সচেতন হয় করোনার ব্যাপারে, তাহলে এই মারনব্যাধীর করালগ্রাস থেকে অনেক সহজেই বিশ্ব রক্ষা পেতে পারে। আশা রাখি, আপনারাও আমার সাথে সহমত হবেন ও নিজেকে ও অন্যকে বাঁচাবেন এই মহামারীটির হাত থেকে।
ধন্যবাদ।
