Corona in Pujo (1st Part)
————————————————————————
পুজো ও করোনা নিয়ে জনসচেতনতামূলক একটি লেখা লিখলাম। আশা করি সবার ভালো লাগবে। লেখায় বর্নিত ঘটনা ও নামসমূহ সম্পূর্নই কাল্পনিক। বাস্তবের সাথে তার কোনো মিল থেকে থাকলে তা সম্পূর্নই অনভীপ্রেত ও কাকতালীয়।
————————————————————————
লীনা রাস্তার পাশে আইসক্রীম পার্লারটার দিকে আঙ্গুল দেখিয়ে বাবার হাতটা ধরে লাফাতে লাফাতে বলতে থাকে, “বাবা, বাবা, আইসক্রীম খাবো!” ছোট্ট এই মেয়েটির বয়স ৪ কি ৫ বছর হবে। পুজো মানে সে জানে নতুন সুন্দর সুন্দর জামা কাপড় পরা, রাতে বাবা মার হাত ধরে ঠাকুর দেখতে যাওয়া ও আইসক্রীম খাওয়া। প্রায় প্রতিদিন ঠাকুর দেখতে বেরিয়ে তার একটি করে আইসক্রীম প্রাপ্তি ঘটে তার বাবা, সুনির্মল বাবুর থেকে। প্রথমটায় তিনি তাঁর ছোট্ট মেয়েটিকে আইসক্রীম খেতে বারন করলেও পরে তার সেই ছোট্ট কাঁদো কাঁদো মুখটির দিকে তাকিয়ে আর নিজেকে সামলাতে পারেন না। মেয়ের মুখের সুন্দর ছোট্ট হাসিটি তার কাছে হাজার হাজার মনি মানিক্যের থেকেও অমূল্য। সুনির্মল বাবু তাই আর দেরি করেন না। লীনাকে তার পছন্দসই একটি আইসক্রীম কিনে দেন, তার মুখে সুন্দর ছোট্ট হাসিটি ফিরিয়ে আনবার জন্য।
এবারের পুজোটা একটু অন্যরকম। অন্যবারের তুলনায় রাস্তায় লোক বেশ কম, এবং অধিকাংশ মানুষই মাস্ক পরে বেরিয়েছেন রাস্তায়। কিন্তু খাবার সময় কি আর মাস্ক পরে খাওয়া যায়? আর সেইটাই হয়েছে এই আইসক্রীম পার্লারটির সামনে। দোকানটায় ঠিক সেরকম উপচে পড়া ভিড় নেই, কিন্তু তাও কিছু লোকজন দোকানটার সামনে ও ভেতরে রয়েছে। কেউ আইসক্রীম কিনতে ব্যস্ত এবং কেউ খেতে। সুনির্মল বাবু সেটা দেখে লীনার দিকে একটু ঝুঁকে পড়ে বললেন, “সোনা, আমরা কাল খাবো আইসক্রীম। নাহলে তোমার ঠান্ডা লেগে যাবে। জ্বর হবে। কষ্ট হবে। কালকে মদন কাকুর দোকান থেকে একটা বড় কর্নেটো কিনে দেবো তোমায় কেমন?” লীনার মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দেন তিনি।
কিছুক্ষনের মধ্যেই মত পাল্টাতে বাধ্য হন সুনির্মল বাবু। তিনি যে মেয়ের কাঁদো কাঁদো মুখ সইতেই পারেন না। তিনি বললেন, “আচ্ছা, আচ্ছা আর কান্নাকাটি নয়। বাবা আইসক্রীম কিনে দেবে আমার ছোট্ট সোনাকে। চলো, কোন আইসক্রীমটা খাবে বলো।” কথাটা শুনেই লাফিয়ে ওঠে লীনা। বাবাকে তার ছোট্ট দুটো হাতে জড়িয়ে ধরে তাঁর গালে একটা চুমু খায় সে। সুনির্মল বাবুও খুশি হয়ে লীনাকে জড়িয়ে ধরে একটি ছোট্ট চুমু খেয়ে তার হাত ধরে নিয়ে চললেন দোকানের দিকে।
আইসক্রীম কেনা হলো। সেটি হাতে পেয়েতো লীনা আনন্দে আত্মহারা। সঙ্গে সঙ্গে মুখের মাস্কটা নামিয়ে সেটি অল্প অল্প করে খেতে শুরু করেছে সে। সুনির্মল বাবু পয়সা মিটিয়ে মেয়ের দিকে তাকিয়ে দেখেন যে সে সেটি খেতে শুরু করে দিয়েছে ততোক্ষনে। মনে মনে নিজের ওপর একটু রাগ হলো তাঁর। “ইস! আইসক্রীমটা নিজের হাতে রাখলেই ভালো হতো। বাড়ি গিয়ে মেয়েটাকে দিতাম। কতোক্ষনই বা লাগতো বাড়ি যেতে? এই সামনের গলিটা দিয়ে চলে গেলে ১৫-২০ মিনিট লাগতো হয়তো বাড়ি পৌঁছোতে। বা দোকানটা থেকে বেরিয়ে ফাঁকা রাস্তায় এসে আইসক্রীমটা মেয়ের হাতে দিতে পারতাম। দোকানের মধ্যে এই এত্তোগুলো মাস্ক অপরিহিত অবস্হায় খাদ্যরত মানুষের মাঝে মেয়েটা মাস্ক খুলে জিনিসটা খেতে শুরু করলো! না! না! এটা একদম উচিত হয় নি!” যেমনই ভাবা, তেমনই মেয়ের হাত ধরে একটি ছোট্ট টান দিয়ে সুনির্মল বাবু দোকানটা ছেড়ে বেরিয়ে এলেন ও আর অন্য কোথাও না গিয়ে, সোজা সামনের গলিটার দিকে পা বাড়ালেন বাড়ির উদ্দেশ্যে।
পুজোও শেষ হলো, আর লীনাও হাসপাতালে ভর্তি হলো। সে করোনা আক্রান্ত। ছোট্ট শরীরটি এই রোগটির নাগপাশে আবদ্ধ হয়ে আর নড়াচড়াও করতে পারছে না। ডাক্তারেরা আপ্রান চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন যাতে ছোট্ট লীনা সুস্থ হয়ে আবার তার বাবাকে জড়িয়ে ধরতে পারে তার ছোট্ট দুটি হাতের মাঝে, সে যেন আবার তার বাবার কাছে একটি আইসক্রীম খাবার বায়না করতে পারে। সুনির্মল বাবু আর কথা বলবার অবস্হায় নেই। সেইদিনের একটি ভুল তাঁকে কুরে কুরে খাচ্ছে। তাঁর কানে তাঁরই বলা কিছু সংলাপ সর্বোক্ষন বেজে চলেছে, “সোনা, আমরা কাল খাবো আইসক্রীম। নাহলে তোমার ঠান্ডা লেগে যাবে। জ্বর হবে। কষ্ট হবে।...” তিনি মেয়ের কাছে যেতে সাহস পাচ্ছেন না, কিন্তু মনে মনে প্রার্থনা করছেন যেন লীনা হাসপাতালের বেডটা ছেড়ে উঠে তাঁর দিকে লাফাতে লাফাতে ছুটে আসে তাঁকে জড়িয়ে ধরবার জন্য, আর বলে, “বাবা, বাবা, আইসক্রীম খাবো!”.....
আশা রাখি লীনা সুস্থ হয়ে যাক ও গোটা বিশ্বব্যাপী যতো মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হয়েছেন, তাঁরা মা দূর্গার মর্তে আগমনের পর তাঁর আশীর্বাদে সুস্হ হয়ে যান। চারিদিকে এতো মৃত্যু সংবাদ শুনতে শুনতে খুব ক্লান্ত লাগে। তাই আর ওপরের কাল্পনিক ঘটনার মতো কোনো ঘটনা বাস্তবে ঘটুক এ আমি কখনোই চাই না। তাই বলি, পুজো আসছে, আপনারা আনন্দ করুন। চেষ্টা করুন একটু ঘরে থাকতে। টিভিতে বিভিন্ন খবরের চ্যানেলে বিভিন্ন মন্ডপ ও ঠাকুর দর্শন করুন। যতোক্ষন বাড়ির বাইরে থাকবেন ততোক্ষন মাস্ক খুলবেন না। চেষ্টা করুন বাইরের খাবার যতোটা সম্ভব না খাওয়ার। আর যদি ইচ্ছা হয় বাইরের খাবার খেতে, তাহলে খাবার কিনে ঘরে এনে খান। বাইরে কোনোমতেই মাস্ক খুলবেন না। নিজের ও আপনজনদের খেয়াল রাখুন ও সুস্থ থাকুন।
ধন্যবাদ।
