Nehar Sustho Howa

————————————————————————
একটি অন্য ধরনের গল্প লিখলাম আজ। রইলো তা নীচে। কেমন লাগলো আপনাদের, তা যদি জানতে পারি, খুব ভালো লাগবে আমার। গল্পে বর্নিত চরিত্র ও ঘটনাবলী কাল্পনিক। বাস্তবের সাথে এর কোনো মিল থেকে থাকলে তা সম্পূর্নই কাকতালীয়।
————————————————————————

নেহার গায়ে নিজের ডান হাতটা রেখে একটু আলতো করে চেপে ধরে সুজন বললো, “আজকে তুমি সুস্থ হবেই নেহা। সুস্থ হবেই। অনেক কষ্ট পেয়েছো, অনেক, অনেক! আর নয়! আর কোনো ভাবেই নয়! আজকে তুমি সুস্থ হবেই দেখো, সুস্থ তুমি...” - পুরো কথা শেষ করতে পারে না সুজন। গলা কেঁপে ওঠে তার। অম্ল জলবিন্দু ফুটে ওঠে তার দুই চোখের কোনে। নিজের কপালটা নেহার গায়ে আলতো করে ছুঁইয়ে মুখ ঢাকে সে। নেহা তার সেই কৃত্রিম অপলক দৃষ্টিতেই তাকিয়ে থাকে সুজনের দিকে। সেই দৃষ্টিতে নেই কোনো উত্তেজনা, নেই কোনো উদ্দীপনা। বার বার জীবনযুদ্ধে হেরে যেতে যেতে ক্লান্ত হয়ে যাওয়ায় তাই, সুজনের এই আশাব্যাঞ্জক কথাগুলি কোনো দাগ কাটে না নেহার মনে। সে দাঁড়িয়ে থাকে অবিচল ও ভাবলেশহীনভাবে।

নিজেকে একটু সামলে নিয়ে চোখ মুছে সুজন বললো, “চলো, তবে যাওয়া যাক!” - বলে গাড়িটায় স্টার্ট দিলো সে। নিজেদের বাড়ির পার্কিং লট থেকে বেরিয়ে রাস্তায় উঠে দিকচক্রবালের দিকে মিলিয়ে যেতে থাকে তারা আস্তে আস্তে। একটু শীতল অথচ মনোরম হাওয়া বয়ে বেড়াচ্ছে চার পাশে। ভোরের স্বল্প আলোয় পাখপাখালীদের মধ্যে কূজন শুরু হয়েছে। উদীয়মান সূর্যদেব যেন তাদের বেরোনোরই অপেক্ষায় ছিলেন। বাড়ি থেকে বেরিয়ে কাছের ব্রীজটায় উঠেই তাঁকে দেখতে পায় তারা দুজনে। সুজন মনে মনে তাঁকে প্রনাম করে একটু স্মিত হেঁসে বলে ওঠে, “দেখো নেহা, আজ যেন সূর্য আমাদের বেরোনরই অপেক্ষায় ছিলো! তুমি একদম চিন্তা কোরো না। সব ঠিক হয়ে যাবে দেখবে।”

অবিচলিত নেহা অবিচলিতই রইলো। তবে এই কথা গুলো যেন তার মনে একটু হলেও আশার আলো জাগাতে পেরেছে। মনে মনে সূর্যদেবকে একটু প্রনাম করে সে। নিজের অজান্তেই যেন খুব ক্ষীন একটি স্মিত হাসির রেখা ফুটে ওঠে তার আশাহীন প্রানহীন মুখটিতে।

ডাক্তারখানায় যথা সময়ে এসে উপস্থিত হয় তারা দুজনে।একজন নার্স ভদ্রলোক তাদের স্বাগত জানিয়ে সুজনকে বোসতে বলেন ও নেহাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবার জন্য উদ্যত হন। দুজনের হাত ছাড়াছাড়ি হবার আগে, সুজন আরও একবার নেহার হাতটা চেপে ধরে একটু টান দেয় নিজের দিকে। নেহার সারা শরীর যেন ছেড়ে গিয়েছে। তাকে নিয়ে এখন কি করা হবে না হবে তাতে তার আর কোনো ভয়, দুঃখ, চিন্তা কিছুই নেই। সে সুজনের টান খেয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে ঠিকই কিন্তু তার প্রানহীন দৃষ্টি দিয়ে সে সামনের দিকেই অপলকভাবে তাকিয়ে থাকে। সুজন নেহার হাতটা চাপা অবস্থাতেই বলে ওঠে, “একদম চিন্তা কোরো না। ডাক্তার তোমায় সারিয়ে তুলবেনই। আর আজকেই তুমি সুস্থ হয়ে যাবে। আর তারপর, আমরা দুজনে মিলে দূরে কোথাও বেড়াতে যাবো কেমন!...” বলে একটু স্মিত হাসে সে। তারপর চোখের ইশারায় নার্স ভদ্রলোকটিকে নেহাকে নিয়ে যাবার জন্য বলে সুজন। তিনি তার কথা মতো নেহাকে নিয়ে ভেতরে চলে যান আস্তে আস্তে। টলো মলো পায়ে চলতে থাকা নেহাকে যতোক্ষন দেখা যায় ততোক্ষন দাঁড়িয়ে থাকে সুজন। তার মনের ভিতরটা ফুঁপিয়ে উঠতে থাকে। কিন্তু আসেপাশে লোকজন থাকায় কোনো মতে নিজেকে সামলায় সে।

নেহা ভিতরে চলে যাবার বেশ কিছুটা সময় পর চমক ভেঙ্গে সম্বিত ফিরে পেয়ে আস্তে আস্তে করে একটি বসবার চেয়ারের দিকে এগিয়ে যায় সুজন। চেয়ারে ধপ করে গা এলিয়ে দিয়ে এক গভীর দুশ্চিন্তায় নিমঘ্ন হয়ে পড়ে সে। নেহার চিকিৎসার জন্য ইতিমধ্যেই তার প্রচুর টাকা খরচা হয়ে গেছে। বেশ কিছু টাকা দেনাও করতে হয়েছে তাকে। কিন্তু কেও তার নেহাকে সারিয়ে তুলতে পারেনি। সবাই বলেছে তার নেহা আর ভালো হবে না। আবার এহেন মানুষও আছেন যাঁদের কাছ থেকে তাকে শুনতে হয়েছে, তার নেহা “পাপী”! সে যেন নেহাকে এক্ষুনি “ত্যাগ করে”!

কিন্তু সুজন আশা ছাড়েনি। সে ক্রমাগত ইন্টারনেটে পড়াশুনা করে গেছে তার নেহার রোগটির ব্যাপারে। আস্তে আস্তে করে সে বুঝেছে যে সেই “দুর্বোধ্য” রোগটির চিকিৎসা বর্তমান এবং সেটি একটি-দুটি জায়গাতেই সম্ভব। সে তাই নতুন করে আশা নিয়ে সেই বিষয়ে পড়াশুনা শুরু করে এবং দিন দিন তার ভিতর থেকে তাকে কেউ যেন ফিস ফিস করে বলে দিতে থাকে, “তুমি কারোর কথায় কান দিও না সুজন.... যে পথে তুমি এগোচ্ছো, সেটাই ঠিক.... কারোর কথায় হতোদ্যম হয়ে যেও না.... তোমার নেহা সুস্থ হবেই.... তোমার নেহা সুস্থ হবেই....”।

চিন্তিত সুজন দুহাতে মুখটা ঢেকে নিয়ে এক দৃষ্টে ডাক্তারখানার মেঝের দিকে তাকিয়ে থাকে। নিজের ইষ্ট দেবতাকে স্মরন করে সে ভাবতে থাকে, “ঠাকুর! এই শেষ চেষ্টা। আর আমার নেহাক কষ্ট দিও না তুমি! তুমি ওকে সুস্থ করে দাও গো ঠাকুর, তুমি ওকে সুস্থ করে দাও....!” তার অজান্তেই দুফোঁটা চোখের জল তার হাতগুলিকে সিক্ত করে দেয়।

প্রায় ৬ ঘন্টার দীর্ঘ অপেক্ষার অবসানের পর হঠাৎ সামনের প্যাসেজটায় নেহাকে নিয়ে যাওয়া সেই নার্সকে তারই দিকে এগিয়ে আসতে দেখে প্রায় লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ায় সুজন। হ্রৎপিন্ডটি যেন তার শরীরের বাইরে বেরিয়ে আসতে চাইছে উত্তেজনায়। সারা শরীর তার কেঁপে চলেছে ক্রমাগত। আস্তে আস্তে সেই নার্স ভদ্রলোকটি সুজনের সামনে এসে দাঁড়ায়। সুজন চাইছে তাঁকে জিজ্ঞেস করবে যে তার নেহা কেমন আছে, কিন্তু কিছুতেই সে কিছু কথাই বলতে পারছে না। সে শুধু বড় বড় চোখ করে সেই নার্স ভদ্রলোকটির দিকে তাকিয়ে থাকে। তিনি তখন একটু হেঁসে বলেন, “মিস্টার ব্যানার্জী, আপনার “গাড়ি” সম্পূর্ন সুস্থ! দীর্ঘকাল তাকে ঠিকভাবে পরিচর্যা না করায় তার এরকম অবস্থা হয়। এখন সে সম্পূর্ন সুস্থ। তবে ওকে চাপ দেবেন না বেশী। ভালোবেসে ব্যবহার করবেন আর নিয়মিত ওর পরিচর্যা করবেন, তাহলেই দেখবেন ও-ও আপনাকে কম ভালোবাসছে না।”... বলে একটু হাসলেন তিনি।

সুজন হাঁসবে, না কাঁদবে কিছুই বুঝে উঠতে পারে না। তার দুই হাত নিজের অজান্তেই উপরে উঠে আসবার চেষ্টা করে সামনে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে থাকা তার গাড়ির কোম্পানীর সার্ভিস ভদ্রলোকটিকে একটি অনাবীল আনন্দময় আলিঙ্গনে জড়িয়ে ধরবার জন্য। কিন্তু নিজেকে সামলায় সে। সে কোনমতে একটু ঢোঁক গিলে ও একটু হেঁসে শুধু বলে, “থ্যাঙ্ক ইউ সো মাচ।” সেই সার্ভিস ভদ্রলোকটি আর একটু হেঁসে বলেন, “আসুন আপনার গাড়ি আপনার জন্য অপেক্ষা করছে বাইরে।” তারপর তিনি পিছন ফিরে বাইরের দরজার দিকে পা বাড়ান। সুজন মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাঁকে অনুসরন করতে থাকে।

বাইরে বেরিয়ে এসে সেই ভদ্রলোকটি একটি নির্দিষ্ট দিকে তাঁর ডান হাতটি ইঙ্গিত করে সুজনের দিকে তাকিয়ে হেঁসে বললেন, “এই যে মিস্টার ব্যানার্জী, আপনার গাড়ি।” সুজন তাঁর সেই হাতের দিক অনুসরন করে যা দেখতে পেলো তা সে কোনওদিনও দেখেছে কিনা মনে করতে পারে না।

একি তারই নেহা, না অন্য কেউ! না! লাইসেন্স প্লেটের নাম্বারটাতো তার নেহারই।

কিন্তু তার মন বিশ্বাসই করতে চায়না যে সামনে যে গাড়িটি দাঁড়িয়ে আছে, এটি “তারই নেহা!” সুজনের থতোমতো ভাবটা কাটে সার্ভিস ভদ্রলোকটির কথায়। তিনি বলেন, “আমরা আপনার গাড়ির অসুবিধে গুলো সারানোর পর, কার ওয়াশে দিয়ে ওকে পুরো পরিস্কার করিয়ে দিয়েছি আপনার জন্য। এটা কম্প্লিমেন্টারি সার্ভিশ আমাদের কাস্টোমারদের জন্য।” সুজন এবার খুবই বিনীত ভাবে বললো, “থ্যাঙ্ক ইউ সো মাচ ফর অল অফ দিস।”

সার্ভিস ভদ্রলোকটি তাকে বলে দিলেন যে নেহাকে ঠিক ঠাক রাখতে গেলে তার করনীয় কি কি হবে। সে গুলো খুব মন দিয়ে বুঝে তাঁকে একটি বিরাট অভিবাদন জানায় সে। সার্ভিস সেন্টারের সমস্ত টাকা পয়শা মিটিয়ে সুজন ফিরে আসে নেহার কাছে। এখানেও তার বেশ কিছু টাকা খরচা হলো ঠিকই কিন্তু আজ সে যে আনন্দে আনন্দিত, তখন তার মনে কোনোরকম খরচের চিন্তাই নেই। হবেটাই বা কি করে! সে তার গাড়িতে বোসে ইঞ্জিন স্টার্ট করতেই যে সুন্দর অনুভূতিটি পেলো, সেটা সে এর আগে কোনওদিনও পায়নি যবে থেকে নেহা তার জীবনে এসেছে। একইভাবে গাড়ির বিভিন্ন যন্ত্রাংশ এতো মসৃন ও সুন্দরভাবে যে কাজ করতে পারে সেটা কখনো কল্পনাই করতে পারেনি সুজন। তার মনে হলো, অবশেষে তার নেহা, তার দুমাস আগে কেনা সেকেন্ড-হ্যান্ড গাড়ি, হাঁসছে। সে আস্তে আস্তে সার্ভিশ সেন্টার থেকে তার নেহাকে নিয়ে বাইরে রাস্তায় বেরিয়ে এসে একটি নিরিবিলি জায়গায় রাস্তার পাশে গাড়িটিকে দাঁড় করিয়ে স্টিয়ারিংটির ওপর ঝুঁকে পড়ে একটি চুমু খায়। সে আর নিজেকে সামলাতে পারে না। অঝোর ধারায় অশ্রুধারা নেমে আসে তার দুচোখ বেয়ে।

নেহা সুস্থ ও ভালো থাকুক এবং সুজন ও নেহার এই সুন্দর সম্পর্ক আরও মধুময় হোক এই আশা রাখি।🙂