Grandfather Mountain Trip, October 23, 2023

অষ্টমীর দিন সকালে ঘুম ভেঙ্গে গেলো অনেক ভোরে। উঠতে ইচ্ছা করলো না। কারণ উঠলেই সেই রোজকার মতো দাঁত মেজে কফি আর কিছু ব্রেক ফাস্ট বানিয়ে একটু খবর দেখা, আর তারপর কাজে নিমজ্জিত হওয়া। তাই আবার কম্বল মুড়ি দিয়ে শুলাম। দু’ঘন্টা পর উঠে ঠিক একই কথা ভাবলাম। তবে এবারে আর শুলাম না, কারণ বেলা বেড়েছে। যথারীতি নিত্যনৈমিত্তিক কাজ সেরে নিজের কাজ নিয়ে বোসলাম। কিন্তু কিছুতেই মন যেন কাজে বোসছে না। অবশেষে ১১ টার সময় স্নেহার সঙ্গে (বা আমার গাড়ির সাথে) বেরিয়ে পড়লাম গ্র্যান্ডফাদার মাউন্টেনের উদ্দেশ্যে। অ্যাপেলেসিয়ান পর্বতমালার একটি শিখর হলো এই গ্র্যান্ডফাদার মাউন্টেন যা অবস্থিত নর্থ ক্যারোলিনায়। আমার বাড়ি থেকে সেখানে পৌঁছতে সময় লাগে প্রায় ৬ ঘন্টার কাছাকাছি। বেরোনোর সময় হিসেব কষে দেখেছিলাম যে সময় পৌঁছোবো সে সময় সবকিছু ঠিক থাকলে সুন্দর সূর্যাস্ত দেখতে পাবো।

অনেক কাল পর পাহাড়ে উঠতে গিয়ে একটু ভয়ই লাগছিলো আমার। এরকম এর আগে রোন পর্বত আর উনাকা পর্বতে ওঠার সময় একটু হয়েছিলো রাস্তার কারণে। হয়তো সেই কারণেই আমার স্নেহার পেছনের চাকার কন্ট্রোল আর্মের একটু ক্ষতি হয়েছে সেই ২০২১ কি ২২ থেকে। কিন্তু সবচেয়ে ভয় লেগেছিলো আমার জর্জিয়াতে বেল পর্বতে ওঠার সময়। ঐরকম খাড়া রাস্তা কখনো কোথাও দেখিনি। বেশ মনে পড়ে সেই ঘটনার কথা যখন দেখছিলাম যে সামনের মস্ত গাড়িটির সবকটি চাকা সামনের দিকে তীব্র বেগে ঘুরচে অথচ সমগ্র গাড়িটি আমার স্নেহার দিকে নেমে আসছে! সেই খাড়াইতে ব্রেক ছাড়লেই গাড়ি পিছনের খাদের দিকে নামবে। তাই ঐ রাস্তায় গাড়ি কোনোভাবে চড়াইতে ওঠবার সময় জ্যামের কারণে দাঁড়িয়ে পড়লেই বিপদের ডঙ্কা বাজে মনে। অনেকটা সেইরকম অনুভূতিই হলো আমার এই গ্র্যান্ডফাদার পর্বতে।

পাহাড়টির রাস্তা খুব খাড়াই হলেও অন্য সমস্ত পাহাড়ের তূলনায় এখানকার বন্দোবস্ত অনেক ভালো। পাহাড়ের পাদদেশ থেকে চূড়া পর্যন্ত অন্ততপক্ষে ৩-৪ টি বড় পার্কিং লটের বন্দোবস্ত করা হয়েছে যাতে মানুষ সেখানে এসে গাড়ি নিয়ে একটু বিশ্রাম করতে পারে। এরকমটা খুব কম পাহাড়েই আছে দেখেছি। হয়তো এমন বন্দোবস্তের জন্য এখানে প্রবেশমূল্য $২৮। একদম শিখরে একটি বড় পার্কিং লটে প্রচুর গাড়ির সমাহার। মূল শিখরটি সেই পার্কিং লটের সাথে একটি লোহার ঝুলন্ত সাঁকোর সাহায্যে যুক্ত। সেখানে হাড় হীম করা ঠান্ডা হাওয়ার দাপট প্রবল! আমি গাড়িতে বোসে থাকতে থাকতেই মনে হচ্ছিল যেন হাওয়া স্নেহাকে উল্টে না দেয়।

সেখানে পৌঁছে কিছু খেয়ে বেরোলাম মূল শিখরে চড়বার উদ্দেশ্যে। মানুষের চলবার তেমন অসুবিধে সেখানে না থাকায় অনেক মানুষই যায় সেখানে। তবে সেখানকার সবচেয়ে ভয়াবহ প্রতিকূল অবস্থাই হলো সেই তীব্র গতিবেগের হীমেল হাওয়া। যেহেতু শিখরে কোনো রেলিং নেই, এবং নিজেকে পাথরের খাঁজে খাঁজে পা হাত বসিয়ে বসিয়ে নিজের পথ খুঁজে উঠতে হয় ওপরে, সেইহেতু হাওয়ার দাপটে রীতিমতো মনে হচ্ছিলো যে হাওয়া যেন ফেলে না দেয় আমায় খাদে। সেই লোহার সাঁকোটির উপর দিয়ে চলার সময় রীতিমতো বাঁশির আওয়াজের মতো শব্দ তৈরী হচ্ছিলো হাওয়া চলাচলের জন্য। শুধু তাই নয়, প্রতিটি লোহার পাটাতনের ওপর পা ফেললে এক একটি নতুন সুর তৈরী হচ্ছিলো বাঁশির মতো। তবে হ্যাঁ এই অভিজ্ঞতাটি খুব সুন্দরভাবে প্রস্ফুটিত হবে যদি গোটা সাঁকোতে দুতিন জনের বেশী লোক না থাকে একই সময়ে এবং সৌভাগ্যবশত পর্বত শিখর থেকে ফিরে আসবার সময় এই পরিস্থিতির সম্মুখীন আমি হয়েছিলাম।

অবশেষে সেই সুন্দর পরিবেশের সূচনা হলো যার কারণে পাড়ি দেওয়া এই এতটা পথ। সূর্যদেব ঢলে পড়তে লাগলেন পশ্চিম দিগন্তে গোটা চরাচরকে রাঙ্গিয়ে দিয়ে। অত্যন্ত ঠান্ডা থাকায় অবশেষে এই সুন্দর শোভা চোখ ভরে দেখলাম স্নেহার সীটে বোসে। পাখিদের কলকাকলি হাওয়ার দাপটে চাপা পড়েছে ঠিকই কিন্তু সেই সুন্দর মেঘ ও রঙের খেলা মনটাকে নির্মল আনন্দে ভরিয়ে দিতে থাকে অবিরত। মন থেকে আপনা আপনিই বেরিয়ে আসে, "ওঁ জবাকুস্ম সংকাসং কাস্যপেয়ং মহাদ্যুতিম্ ধন্ত্যারিং সর্বপাপঘ্নম প্রমতস্মৈ দিবাকরম…”। অবশেষে সূর্যদেব অস্ত গেলেন, এবং প্রায় সাথে সাথেই ঝুপ করে অন্ধকার নামতে শুরু করলো পাহাড়টির গায়ে। আবার সাবধানে স্নেহার সাথে ফিরে এলাম পাহাড়ের পাদদেশে। সেখানে পৌঁছে একটু নিঃশ্বাস নিয়ে অবশেষে গপ্পো মীরের ঠেকে তারানাথ তান্ত্রিক ও তারপর সান্ডে সাস্পেন্সের পর্ণশবরীর শাপ ও অরণ্যের প্রাচীন প্রবাদ শুনতে শুনতে ফিরে চললাম বাড়ির উদ্দেশ্যে…।